মোবাইল আসক্তির কালো দিক! (The dark site of mobile addiction)

স্মার্টফোনের সাথে আমরা সবাই পরিচিত। এটা যেন আমাদের নিত্য দিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। স্মার্টফোন ছাড়া একটা সেকেন্ডও কল্পনা করা যায় না। দিনের অবসর সময় গুলোতে প্রয়োজন বা অপ্রয়োজনে সারাদিনই আমরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে থাকি।

কিন্তু বর্তমানে বেশিরভাগ কিশোর- কিশোরীরা মাত্রাতিরিক্ত হারে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে। যার ফলে এটি মানুষের ব্যাক্তিগত, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে নানা ধরনের প্রভাব বিস্তার করছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাত্রাতিরিক্ত আড্ডা সমাজজীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।

ওয়াল্ড স্টেটস এর তথ্যমতে,

দেশে প্রতি ১০ সেকেন্ডে নতুন করে একটি ফেসবুক আইডি খোলা হচ্ছে , যা দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ২০০৬ সালে মোবাইল ব্যবহার কারীর সংখ্যা  ২ কোটি হলেও বর্তমানে ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী  মোবাইল ব্যবহার কারীর সংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি ৩৪ লাখ হয়েছে।

ইন্টারনেট ওয়াল্ড স্টেটস এর তথ্য অনুসারে,  ২০০৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা পৃথিবীর প্রায় ৪ বিলিয়নের অধিক মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করতো যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৫০ ভাগ। ২০১৮ সালের জানুয়ারী পর্যন্ত বিটিআরসি ( BTRC) এর হিসেব মতে,  বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহার কারীর সংখ্যা ছিলো ৮০,২৮৯ মিলিয়ন।

এদের মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার কারীর সংখ্যা ছিলো সর্বাধিক ৭৫,৩৯৬ মিলিয়ন। সাংবাদিকদের  সাথে মত বিনিময়ে এমন তথ্যই তুলে ধরেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনার।

স্মার্টফোন ব্যবহার বৃদ্ধি একদিকে যেমন আমাদের আর্থিক ও সামাজিক উন্নতি বৃদ্ধি করছে ঠিক তেমনি অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার যেন আসক্তিতে রুপান্তরিত করছে।

চাঁদপুরের এক কিশোর বাবার কাছ থেকে নতুন মোবাইল চেয়েছিলো।  কিন্তুু বাবা তাকে মোবাইল কিনে দিতে না চাইলে আত্মহত্যার হুমকি দেওয়া হইছিলো। যার ফলে বাধ্য হয়ে বাবা তার ছেলেকে মোবাইল কিনে দিলো। বগুড়ার এক মেয়ে বাবাকে বলেছিলো মোবাইল ফোন কিনে না দিলে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করবে।

খবরের কাগজ হাতে নিলেই এইরকম হাজারো ঘটনা আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।  অল্প বয়সে পরিবারকে চাপের মুখে ফেলে এইভাবেই মোবাইল ফোন হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।  শুধু অল্প বয়সি কিশোর-কিশোরীরাই না পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও মোবাইল ফোনে আসক্তির সৃষ্টি হচ্ছে।

আর এই আসক্তি গুলো পারিবারিক সম্পর্কে বিঘ্নতা ঘটাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিনাত হুদা জানান,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মোটেও আমাদেরকে  সামাজিক করছে নাহ। এক ধরনের বাস্তবতা বিরোধী অবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

যার ফলে মানুষের মানবিকতা বোধ, পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, পারস্পরিক সম্পর্ক,সহানুভূতি  ইত্যাদি মূল্যবোধ গুলো নষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া মানুষের সাথে মানুষের কথা বলা, একে অপরকে সময় দেওয়া,  একসাথে খেলা করা ইত্যাদি সবকিছুই আজ বিলুপ্ত  শুধু মাত্র মোবাইল আসক্তির ফলো।

আমরা আমাদের বাবা-দাদার মুখে শুনেছি গ্রামের অলিতে-গলিতে বাচ্চারা বিভিন্ন ধরনের খেলা যেমন, ক্রিকেট, বেডমিনটোন,হকি,ফুটবল ইত্যাদি খেলতো এবং বুড়োরা বসে গল্প করতো, আড্ডা দিতো, একে অপরের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতো।

কিন্তুু বর্তমানে মোবাইল আসক্তি এতোটাই বেড়ে গেছে যে, চারদিকে তাকালে এইধরনের খেলা, আড্ডা কিছুই তেমন আর চোখে পড়ে নাহ। যেদিকেই তাকাই শুধু শিশু-কিশোরদেরকে মোবাইল নিয়েই বসে থাকতে দেখি।  BTRC এর সর্বশেষ তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রায় ১০ কোটি ৩২ লাখ মানুষ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত।

যার মধ্যে  মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী রয়েছে শতকরা প্রায় ৩৫ শতাংশ।  যা শিক্ষার মানকে নষ্ট করছে। এর ফলে দিন দিন বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে, মানুষ জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ছে। এর ফলে দিন দিন বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ নষ্ট হচ্ছে।

বর্তমানে প্রতিবছর মোবাইল গেমিংয়ে ১৯ শতাংশ লোক বৃদ্ধি পাচ্ছে।  আর এই মোবাইল গেমিংয়ের ফলে মানুষ তার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছি।  নানা ধরনের শারীরিক সমস্যায় উপনীত হচ্ছে।  জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফ বলেছে,  বাংলাদেশে ১৩-১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৩৩ শতাংশই অনলাইনে বিপদের মুখে রয়েছে।

এই তথ্য অনুসারে প্রায় ৩ জন ইন্টারনেট ব্যবহার কারীর মধ্যে ১ জন হলো শিশু।  প্রতিদিন প্রায় ১ লক্ষ  ৭৫ হাজার লোক ইন্টারনেটে যুক্ত হচ্ছে।  অর্থাৎ প্রতি আধা সেকেন্ডে একজন শিশু ইন্টারনেটে যুক্ত হচ্ছে।  আর মূলত স্মার্টফোনের মাধ্যমে শিশুরা ইন্টারনেটে যুক্ত হচ্ছে।

যার ফলে শিশুদের শারীরিক নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।  মোবাইল ব্যবহারের আসক্তির ফলে একজন শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে, মেধার বিকাশ কমে যাচ্ছে, শারীরিক স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে, ঘাড় ব্যাথা,মাথা ব্যাথা,  চোখের সমস্যা ইত্যাদি নানা ধরনের রোগের সম্মুখীন হচ্ছে।

মোবাইল আসক্তি শুধু শিশু-কিশোরদের মধ্যেই প্রভাব বিস্তার করছে না বরং এটি সমাজজীবনেও  মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এর মাধ্যমে সমাজে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।  ভুল তথ্য মূহুর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হয়ে সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে।

ইন্টারনেটে সহজেই অপরিচিত ব্যাক্তির সাথে পরিচিত হওয়ার সু্যোগ থাকায় অনেক পরিবারে ফাটলের সৃষ্টি হয়।  যা ব্যাক্তি জীবনে নিরাপত্তার একটি বড় হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে।  অধ্যাপক সালমা আক্তার বলেন, অপ্রত্যাশিত সম্পর্কগুলো প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পাচ্ছে যা একটি সুখী পরিবারকে নষ্ট করে ফেলছে।

গবেষকরা বলেন,  দিনে ৫ ঘন্টা বা তার অধিক মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে স্থুলতার ঝুঁকি ৪৩ শতাংশ বেড়ে যায়।  যার ফলে শারীরিক সক্রিয়তা কমে, এতে অকালমৃত্যু,  ডায়াবেটিস, রিদয়রোগ ও নানা ধরনের ক্যান্সার হতে পারে।।

আরও পড়ুন:

মোবাইলের ব্যাটারি ভালো রাখার উপায় 

মোবাইল ফোন ভালো রাখার উপায়

মোবাইল হ্যাং হলে আপনার করনীয়

3G মোবাইলকে 4G করার নিয়ম